এইবারও কি বাংলা দখলের স্বপ্ন বিজেপির অসম্পূর্ণ থাকবে? কী বলছে ফাইনাল জনমত সমীক্ষা

West Bengal Assembly Polls 2026

বিধানসভা নির্বাচন, আর তার আগেই প্রকাশ্যে এসেছে Bengal24x7.in–এর ফাইনাল দফার জনমত সমীক্ষা। এই সমীক্ষা কি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সমস্ত বিরোধিতা, প্রচার যুদ্ধ আর কাগুজে অঙ্ক সত্ত্বেও বাংলার মসনদে আবারও ফিরতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেসই? নাকি বিজেপি এবার সত্যিই ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে উঠবে? জরিপের ফলাফল কিন্তু পরিষ্কারভাবে এক ভিন্ন ছবিই দেখাচ্ছে।

তৃণমূলের সামনে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার রূপরেখা

সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেতে পারে প্রায় ১৬৫ থেকে ১৭০টি আসন। সংখ্যাটা শুধু আরামদায়কই নয়, পরিষ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ইঙ্গিত বহন করে। অর্থাৎ, ভোটের ময়দানে বড় কোনও অঘটন না ঘটলে, মানুষ যে স্থিতিশীল সরকারই চাইছেন – তার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

অন্যদিকে, বিজেপি-র আসন সংখ্যায় চোখে পড়ার মতো উত্থান দেখাচ্ছে এই সমীক্ষা। ২০২১-এর তুলনায় বিজেপি বাড়িয়ে নিতে পারে আসন সংখ্যা, পৌঁছতে পারে ১০০ থেকে ১১৫টি আসনে। তবে এই বৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও, সরকার গঠনের ম্যাজিক ফিগার থেকে এখনও বেশ খানিকটা দূরে গেরুয়া শিবির।

অন্যান্য শক্তি— AIMIM, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট বা স্বতন্ত্ররা— মিলিয়ে পেতে পারেন ১ থেকে ৯টি আসন মাত্র। ফলে স্পষ্ট, মূল লড়াই কার্যত তৃণমূল এবং বিজেপি— এই দুই শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে।

ভোটের হারেই আসল বার্তা: এগিয়ে তৃণমূল

শুধু আসনসংখ্যা নয়, ভোটের হারেও পরিষ্কার ব্যবধান তৈরি করতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস— এমনটাই বলছে Bengal24x7-এর এই জনমত সমীক্ষা।

West Bengal Assembly Polls 2026

  • তৃণমূল কংগ্রেস: ৫৭.৮% ভোট
  • বিজেপি: ৩৯.১২% ভোট
  • AIMIM+: ২.০৪% ভোট
  • কংগ্রেস+ (CONG+): ০.৬৮% ভোট
  • অন্যান্য (OTH): ০.৩৪% ভোট
  • বামফ্রন্ট: ০.০০% ভোট

ভোটের হারের হিসেবেই বোঝা যায়, বিরোধী ভোট এখনও পর্যন্ত ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। বিজেপি তার একচ্ছত্র বিরোধী অবস্থানকে শক্তিশালী করলেও, তৃণমূলের ভোটবাক্সে যে এখনো উল্লেখযোগ্য আস্থার সঞ্চার রয়েছে, জরিপের সংখ্যাই তা প্রমাণ করছে।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে চান বাংলার মানুষ?

বাংলার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্ব–কেন্দ্রিক সমীকরণ দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশ্ন একটাই— মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখতে চান সাধারণ মানুষ? Bengal24x7-এর জনমত সমীক্ষা সেখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ছবি তুলে ধরছে।

  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চান ৪৪.৪% মানুষ
  • শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী পদে দেখতে চান ৩৮.৩% মানুষ
  • মহম্মদ সেলিমকে সমর্থন করেছেন ৪.২% মানুষ
  • অধীর চৌধুরীকে সমর্থন করেছেন ৩.৬% মানুষ
  • মুখ্যমন্ত্রী পদে অন্যান্যদের সমর্থন করেছেন ৪.৯% মানুষ
  • আর ৪.৬% মানুষ এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে এড়িয়ে গিয়েছেন

এই সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় এখনও এগিয়ে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও, তাঁর প্রতি মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশের আস্থা বহাল— এটি নিঃসন্দেহে তৃণমূল শিবিরের কাছে বড় বার্তা।

তৃণমূলের সফট এজ: উন্নয়ন, জনসংযোগ ও ব্র্যান্ড মমতা

জরিপের ফলাফলকে অনেকেই ‘অ্যান্টি–ইনকাম্বেন্সি’র বিপরীতে ‘প্রো–ইনকাম্বেন্সি’–র ইঙ্গিত হিসেবেও দেখতে পারেন। গ্রাম থেকে শহর, দুয়ারে সরকার থেকে স্বাস্থ্যের পরিকাঠামো— দীর্ঘদিনের শাসনের পরও তৃণমূলের ভোট শেয়ার যদি ৫৭–৫৮ শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে, তবে স্পষ্ট যে শাসকদলের উন্নয়ন বার্তা এখনও জনগণের বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ইমেজ— সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছনো, পথের সভা, সহজ ভাষায় যোগাযোগ, এবং বাংলার সাংস্কৃতিক মাটির সঙ্গে নিজের পরিচয়— সব মিলিয়ে তাঁকে এখনও ‘বিকল্পহীন’ নেত্রী হিসেবে তুলে ধরছে এক বড় অংশের ভোটারের চোখে।

বিজেপির উত্থান, কিন্তু কেন এখনও দূরে ক্ষমতার সমীকরণ?

বিজেপি–র আসন সংখ্যা যে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, তা এই সমীক্ষা স্বীকার করছে। ১০০–র গণ্ডি টপকে ১১৫ পর্যন্ত আসন পাওয়ার পূর্বাভাস গেরুয়া শিবিরের জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে প্রশ্ন একটাই— তার পরেও কেন ক্ষমতার সমীকরণ থেকে তারা এখনও দূরে?

তার বড় কারণ হয়তো দুইটিঃ

১. বিরোধী ভোটের পূর্ণ সংহতি না হওয়া – বিজেপি হয়তো প্রধান বিরোধী শক্তি, কিন্তু AIMIM, কংগ্রেস, অন্যান্য আঞ্চলিক বা বাম ভোট— সব মিলিয়ে বিরোধী শিবিরের ভোট এখনও খানিকটা ভাগ হয়ে রয়েছে।

  1. তৃণমূল বিরোধিতার চেয়ে বিকল্প সরকার গঠনের আস্থার ঘাটতি – কেবল শাসকদল বিরোধিতা যথেষ্ট নয়, মানুষ একইসঙ্গে স্থিতিশীল, অভিজ্ঞ, ও স্থানীয় বাস্তবতা–জানা এক বিকল্প সরকারের খোঁজ করেন। সেখানে হয়তো এখনও তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে সামনে আনার ক্ষেত্রে ভোটারের একাংশ দ্বিধায় রয়েছেন।

বাম–কংগ্রেস ও অন্যান্যদের প্রায় অদৃশ্য উপস্থিতি

এই জরিপের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের আশঙ্কাজনক দুর্বল উপস্থিতি। যেখানে বামফ্রন্টের ভোট শতাংশ প্রায় শূন্যের কোঠায়, সেখানে কংগ্রেস+ জোটের সম্ভাব্য ভোট–শেয়ার মাত্র ০.৬৮%–এর আশেপাশে।

বাংলার ঐতিহ্যবাহী রাজনীতিতে একসময় বাম–কংগ্রেস যেভাবে প্রভাব বিস্তার করত, সেই জায়গা এখন প্রায় সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছে তৃণমূল বনাম বিজেপি–র দ্বিমুখী লড়াই। উন্নত সংগঠন, শক্তিশালী জনসংযোগ আর স্থায়ী ক্যাডার বেস— এই তিন ক্ষেত্রেই তুলনামূলক ভাবে এগিয়ে তৃণমূল, আর বিজেপি ক্রমশ নিজেদের গড়ে তুলছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে।

জনমত সমীক্ষা চূড়ান্ত সত্য নয়, তবু ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ

অবশ্যই মনে রাখতে হবে— কোনও জনমত সমীক্ষাই চূড়ান্ত সত্য নয়। নির্বাচন আসার আগে রাজনৈতিক আলাপ–আলোচনা, প্রার্থী বাছাই, জোট সমীকরণ, স্থানীয় বিষয়, এমনকি জাতীয় রাজনীতির হাওয়াও ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। তবু, Bengal24x7.in–এর এই ফাইনাল দফার সমীক্ষা অন্তত এই মেসেজ দিচ্ছে— বাংলার মাটিতে তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত্তি এখনও যথেষ্ট দৃঢ়, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও বাংলার এক বড় অংশের কাছে ভরসার মুখ।

বিজেপি তার আসন সংখ্যা ও ভোট শেয়ার বাড়ালেও, তা কি ক্ষমতায় পৌঁছনোর পক্ষে যথেষ্ট হবে? নাকি আবারও ‘খেলা হবে’ স্লোগানের আবহে তৃতীয়বারের মতো আরও শক্ত হাতে ক্ষমতা ধরে রাখবে তৃণমূল? শেষ উত্তর দেবে ভোটবাক্সই। তবে আপাতত জরিপের অঙ্ক বলছে— বাংলার রাজনীতিতে মমতার প্রভাব এখনো শেষ হয়ে যায়নি, বরং তিনি এখনও প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *